কণিকা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Rabindranath

যথার্থ আপন
কুষ্মাণ্ডের মনে মনে বড়ো অভিমান,
বাঁশের মাচাটি তার পুষ্পক বিমান ।
ভুলেও মাটির পানে তাকায় না তাই,
চন্দ্রসূর্যতারকারে করে 'ভাই ভাই' ।
নভশ্চর ব'লে তাঁর মনের বিশ্বাস,
শূন্য-পানে চেয়ে তাই ছাড়ে সে নিশ্বাস ।
ভাবে, 'শুধু মোটা এই বোঁটাখানা মোরে
বেঁধেছে ধরার সাথে কুটুম্বিতাডোরে;
বোঁটা যদি কাটা পড়ে তখনি পলকে
উড়ে যাব আপনার জ্যোতির্ময় লোকে ।
'বোঁটা যবে কাটা গেল, বুঝিল সে খাঁটি-
সূর্য তার কেহ নয়, সবই তার মাটি ।

ভক্তিভাজন
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম-
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম ।
পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
মূর্তি ভাবে 'আমি দেব'- হাসে অন্তর্যামী ॥

ক্ষুদ্রের দম্ভ
শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির,
লিখে রেখো, এক ফোঁটা দিলেম শিশির ॥

সন্দেহের কারণ
'কত বড়ো আমি' কহে নকল হীরাটি ।
তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি ॥

নিজের ও সাধারণের
চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে,
কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে ।।

একই পথ
দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি ।
সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?

কাকঃ কাকঃ পিকঃ পিকঃ
দেহটা যেমনি ক’রে ঘোরাও যেখানে
বাম হাত বামে থাকে, ডান হাত ডানে ।

মাঝারির সতর্কতা
উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে,
তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে ।।

কুটুম্বিতা
কেরোসিন-শিখা বলে মাটির প্রদীপে,
ভাই ব'লে ডাকো যদি দেব গলা টিপে ।
হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা;
কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা ॥

কর্তব্যগ্রহণ
কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি-
শুনিয়া জগত্‌ রহে নিরুত্তর ছবি ।
মাটির প্রদীপ ছিল; সে কহিল, স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি ॥

ধ্রুবাণি তস্য নশ্যন্তি
রাত্রে যদি সূর্যশোকে ঝরে অশ্রুধারা
সূর্য নাহি ফেরে, শুধু ব্যর্থ হয় তারা ।।

মোহ
নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস,
ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস ।
নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে;
কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে ।।

বিরাম
বিরাম কাজেরই অঙ্গ এক সাথে গাঁথা,
নয়নের অংশ যেন নয়নের পাতা ।

শত্রুতাগৌরব
পেঁচা রাষ্ট্র করি দেয় পেলে কোনো ছুতা,
জান না আমার সাথে সূর্যের শত্রুতা!